আদর্শ মানুষ গঠনে মসজিদ মাদরাসার ভূমিকা

আদর্শ মানুষ গঠনে মসজিদ মাদরাসার ভূমিকা

আদর্শ মানুষঃ আদর্শ শব্দের অর্থ অনুকরণীয়, অনুসরনীয়, নমুনা, দৃষ্টান্ত ও আয়না। আর যে ভালো গুণগুলো আয়ত্ত্ব করে এবং খারাপ গুণলো বর্জন করে তাকে আদর্শ মানুষ বলে। অর্থাৎ যার মধ্যে খারাপ গুণ ব্যাতিত ভালো গুণগুলো বিদ্যমান তাকে আদর্শ মানুষ বলে। যে অনুসরণীয় ৷ এবং যাকে মডেল হিসেবে সত্যিকারর্থে মানা যায় ৷ সেই আদর্শ মানুষ ৷ আজকের নিবন্ধ আদর্শ মানুষ গঠনে মসজিদ মাদরাসার ভূমিকা কী তা নিয়ে ৷

আরও পড়ুনঃ সাত শ্রেণির মানুষ কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবে

আদর্শ মানুষ গঠনে মসজিদ মাদরাসার ভূমিকা

মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুর নাম মসজিদ। মসজিদ ছাড়া মুসলিম সমাজ কল্পনা করা যায় না। মসজিদ শিআরে ইসলাম তথা ইসলামের নিদর্শনাবলির অন্তর্ভুক্ত। কোনো অঞ্চলে মসজিদ থাকার অর্থ হলো সেখানে মুসলমানদের অস্তিত্ব আছে। মসজিদকে আদর্শ ইসলামী সমাজের হৃৎপিণ্ডও বলা যায়। পাহাড়ি অঞ্চলে শহীদ ওমর ফারুক রহঃ এই মসজিদকে কেন্দ্র করেই শাহাদাত বরণ করেছেন ৷ ইসলাম বিদ্বেষী শক্তি তাকে থামিয়ে দিয়েছে ৷ কিন্তু মসজিদ থেমে থাকেনি ৷ তা আরও নান্দনিক মডেলে নির্মিত হচ্ছে ৷

আদর্শ মানুষ গঠনে মসজিদের ভূমিকা

কীভাবে মসজিদ আদর্শ মানুষ তৈরী করছে? মসজিদে সালাত আদায় ছাড়াও উল্লেখযোগ্য কিছু কার্যক্রম পরিচালিত হয় ৷ যেগুলো আদর্শ মানুষ তৈরীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে ৷

আদর্শ মানুষ গঠনে মসজিদ মাদরাসার ভূমিকা
আদর্শ মানুষ গঠনে মসজিদ মাদরাসার ভূমিকা

মক্তব ইসলামী শিক্ষার প্রথম সোপান

ক. মক্তব ৷ এটি দেশের প্রতিটি মসজিদে পরিচালিত একটি শিশুশিক্ষা কার্যক্রম ৷ মুসলিম শিশু-কিশোরদের কুরআনের প্রাথমিক শিক্ষা এখানে দেয়া হয় ৷ দেশের সিংহভাগ মুসলিম এই মক্তবের শিক্ষার্থী ৷ বর্তমানে বিশুদ্ধ কুরআন পাঠক অধিকাংশ মসজিদের ইমাম হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিশুদ্ধ কুরআনের পাঠ শিখতে পারছে অনায়াসেই ৷ কচিমনে কুরআনের প্রভাব পড়ছে এসব শিক্ষার্থীর ৷ ভবিষ্যতে সমাজে সততার সাথে বেড়ে উঠতে সহায়তা করে এটি ৷ উস্তাদ শুধু কুরআনের আরবি পাঠ পড়িয়েই ক্ষান্ত হন না ৷ সালাত ও মৌলিক মাসআলাও শেখান তিনি ৷ নীতি নৈতিকতার পাঠও পায় এই মক্তব থেকে ৷ যার ফলে আদর্শ মানুষ তৈরীতে এর অবদান অনস্বীকার্য ৷ ইমাম হলেন ইসলামী সমাজের নেতা ৷ সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও গুণীজন ৷ আদর্শবান ও সৎ ৷ এমন শ্রেষ্ঠ মানুষের কাছে কুরআনের পাঠ নিয়ে শিশু-কিশোররা ইমামের মত নম্র, ভদ্র, সুশীল ও আদর্শবান হতে শেখে ৷

জুমআর খুতবা

খ. জুমআর খুতবা ৷ বছরে বায়ান্নটা জুমআয় বায়ান্নটা আলোচনা হয় ৷ সমাজ সংস্কারের পাশাপাশি ব্যক্তিগঠনে এই আলোচনা খুবই ফলপ্রসু ৷ জুমআর মেম্বার থেকে ধ্বনিত হয় সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ বক্তব্য ৷ সুদ, ঘুষ, জেনা-ব্যভিচার, অবিচার, হত্যাে, সন্ত্রাস, জুলুম ও সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে হয় আলোচনা ৷ মুসল্লীরা শোনে ৷ বোঝে ৷ শুদ্ধতার পাঠ নেয় ৷ আদর্শ মানুষ হয়ে উঠতে সহায়তা করে এটি ৷ এটা মসজিদের সহকার্যক্রম ৷

তালিম তরবিয়ত

গ. তা‘লীম ৷ বহু মসজিদে নিয়মিত তা’লীম হয় ৷ কুরআন ও হাদীসের দারস হয় ৷ আত্মপরিশুদ্ধির বার্তা দেয়া হয় ৷ মানবিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার মন্ত্র শেখানো হয় ৷ একজন পাক্কা মুসল্লি হওয়ার সবক দেয়া হয় ৷ নিয়মতান্ত্রিক সালাত আদায়কারী ব্যক্তি অন্যায় করতে পারে না ৷ কুরআন বলছে, ‘নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও মন্দকাজ থেকে বিরত রাখে।’ [সূরা আনকাবুত: ৪৫]

আদর্শ মানুষের গল্প শোনানো হয় ৷ যুগে যুগে যারা সমাজশুদ্ধতায় ও বিনির্মাণে অবদান রেখেছেন ৷ শোনানো হয় আল্লাহপ্রিয় সেসব মনীষীদের কর্মস্পৃহার কথা ৷ তাদের জীবনী থেকে উৎসাহ ও প্রেরণা নিয়ে ভালো মানুষ হওয়ার ইচ্ছায় উজ্জ্বীবিত হয় লোকেরা ৷

সালাত

ঘ. সালাত কার্যক্রম ৷ যদিও এটি মসজিদের এক নাম্বার কাজ ৷ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে যখন সবাই মসজিদে সমবেত হয় এতে করে কয়েকটি সুফল আমরা লক্ষ্য করি ৷ যা একজন আদর্শ মানুষের মৌলিক গুণ ৷

ভ্রাতৃত্বের জাগরণ

এক. ভ্রাতৃত্বের জাগরণ ৷ সালাতকে কেন্দ্র করে সমাজের মুসলিম পুরুষগণ মসজিদে জমায়েত হন ৷ হিংসা, বিদ্বেষ ও অহমিকা ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়ে যান তারা ৷ পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন মজবুত হয় ৷ সৌহার্দ্র, সম্প্রীতির সমাবেশ ঘটে ৷ যা একজন আদর্শ মানুষের গুণ ও বৈশিষ্ট্য ৷

আদর্শ মানুষ গঠনে মসজিদের ভূমিকা
আদর্শ মানুষ গঠনে মসজিদের ভূমিকা

নিয়মানুবর্তিতা ও শৃংখলা

দুই. নিয়মানুবর্তিতা ও শৃংখলা ৷ এক ইমামের পেছনে সালাত আদায় সুশৃংখলভাবে ও নিয়মতান্ত্রিকতার সাথে ৷ তা এই মসজিদের কারণেই ৷ সময়জ্ঞান ও শৃংখলাবোধ শেখায় সালাত ৷

পাঠাগার ও গণশিক্ষা

তিন. মসজিদ ভিত্তিক পাঠাগার ও গণশিক্ষা ৷ বেশ কিছু মসজিদে এ কার্যক্রম বিদ্যমান আছে ৷ এগুলোও আদর্শ মানুষ তৈরীর সহকার্যক্রম ৷

আদর্শ মানুষ গড়ার কারখানা মাদরাসা

অপরদিকে আদর্শ মানুষ গড়ার কারখানা হিসাবে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এ দেশের মাদরাসাগুলো ৷ কুরআনিক শিক্ষা মানুষকে সুন্দর, পরিমার্জিত ও আদর্শ মানব হিসাবে গড়ে তোলে। শিক্ষা নিয়ে মুখরোচক একটি প্রবাদ রয়েছে ৷ ‘শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড’ ৷ কিন্তু বর্তমানে তথাকথিক শিক্ষিত লোকদের অমানুষিক আচরণ ও দুর্নীতি পরায়নতা দেখে এই প্রবাদের সংস্কার হয়েছে ৷ যুক্ত হয়েছে সুশিক্ষা জাতির মেরুদন্ড ৷ আর এই সুশিক্ষাই দিচ্ছে এ দেশের মাদরাসাগুলো ৷ জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে যদি ধর্মীয় শিক্ষার আলো না থাকে, তবে সে দক্ষ হাতেই অনিয়ম করবে ৷ একমাত্র ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থাই মানুষের জাগতিক ও পরকালিন সুখ-শান্তির পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে।

মাদরাসা শিক্ষারর পেছনে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন একনিষ্ঠ দক্ষ ও আদর্শ শিক্ষকরা ৷ নামে মাত্র বেতন নিয়ে তারা কুরআনের এ মহান খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছেন ৷ দেশে মোটা দাগে দুটি ধারার মাদরাসা বিদ্যমান ৷ একটি কওমি ৷ অন্যটি আলিয়া ৷ তুলনামূলক কওমি ধারা ইলমী লাইনে বেশি খেদমত দিয়ে যাচ্ছে জাতিকে ৷ এছাড়াও রয়েছে হিফজ ও নূরানী মাদরাসা ৷ যা কওমিরই একটি অংশ ৷ মাদরাসা শিক্ষার মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্যই হলো নৈতিক, সত্যবাদী, সৎ চরিত্রবান ও আদর্শ মানুষ গড়া ৷

জরিপ করে দেখা গেছে মাদরাসা পড়ুয়াদের মধ্যে নব্বই পার্সেন্টই সৎ, দক্ষ ও যোগ্যতার সাথে সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে ৷ আদর্শ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করে নিজেদের উচ্চতায় নিয়ে গেছে ৷ শতকরা দু চারজনের পদস্খলন হতে পারে ৷ হয়েছে ৷ কিন্তু অধিকাংশই সততার জীবন যাপন করছে ৷ কোনো আলেম তার মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে শোনা যায়নি ৷ কিন্তু জেনারেলে উচ্চশিক্ষিত এমন ভূরি ভূরি রয়েছে যারা তাদের মূল্যবান নেয়ামত মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসেছে ৷

আদর্শ মানুষ গঠনে মাদরাসার ভূমিকা
আদর্শ মানুষ গঠনে মাদরাসার ভূমিকা

মসজিদে নববীতে অবস্থিত ‘সুফফা’ হলো ইসলামের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র ৷ রাসূল সা: ছিলেন প্রথম শিক্ষক এবং সাহাবিগণ প্রথম ছাত্র ৷ এখান থেকে ইসলামী শিক্ষার ইতিহাস শুরু হয় ৷ এই প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বিশ্বকে দক্ষহাতে নেতৃত্ব দিয়েছে ৷ সোনার মানুষে পরিণত হয়েছে তারা ৷

এরই ধারাবাহিকতায় তৈরী হয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে কওমি ধারার শিক্ষা কার্যক্রম ৷ যা মূলত আলেম তৈরীর ফ্যাক্টরি ৷ আদর্শ মানুষ তৈরীর কারখানা ৷ যুগে যুগে এই ধারা এই জাতিকে ক্ষণজন্মা মহা মনীষী উপহার দিয়েছে ৷ নামোল্লেখ করলে আলাদা নিবন্ধ করতে হবে ৷ মোটাদাগে হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ., মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ., মাওলানা কাসেম নানুতুবী রহ.সহ অসংখ্য বিদ্বানের হাত ধরে আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে ৷

কওমি মাদরাসাগুলোর বিরুদ্ধে যত অপবাদই দেয়া হোক না কেনো পরিশেষে তা ধোপে টিকেনি ৷ খুলুসিয়্যাতের সাথে নিরলসভাবে যারা কাজ করছে কোনো দমকা হাওয়া তাদের মূলোৎপাটনে সম্ভব নয়, তা দিনের আলোর মতো পরিস্কার ৷

 

শেষ কথা

সুপ্রিয় পাঠক! আমাদের আর্টিকেলগুলো ভালো লাগলে কমেন্ট ও শেয়ার করে হাজারো মানুষের কাছে তা পৌঁছে দিতে পারেন ৷ আপনার কোন মন্তব্য বা পরামর্শ থাকলে তাও জানাতে পারেন ৷ নিচের কমেন্ট বক্সে লিখতে পারেন নির্দ্বিধায় ৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের সাথে যুক্ত হতে ক্লিক করুন ৷ আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করুন ৷ জাযাকাল্লাহ খাইরান ৷

আদর্শ মানুষ গঠনে মসজিদ মাদরাসার ভূমিকা
আদর্শ মানুষ গঠনে মসজিদ মাদরাসার ভূমিকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *