উশর কাকে বলে | ওশর দেওয়ার নিয়ম

উশর কাকে বলে | ওশর দেওয়ার নিয়ম

ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় উশর এক অবিচ্ছেদ্য অংশ তাই ইসলামি রাষ্ট্রের অর্থ ব্যবস্থায় উন্নয়ন সাধন, প্রবন্ধ সাধন এবং দারিদ্র্য বিমোচনে উশর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। যাকাত প্রদান করার সাথে সাথে উত্তরও আদায় করতে হবে। উশর কুরআন হাদিস ও মুজতাহিদ ইমামগণের ইজমার ভিত্তিতে প্রমাণিত।

উশর শব্দের অর্থ হলো এক দশমাংশ। অর্থাৎ দশভাগের একভাগ।

উশরের পারিভাষিক সংজ্ঞা

ইসলামের অর্থনৈতিক ইতিহাস ও ব্যাংকিং গ্রন্থে মোঃ আবু তাহের বলেছেন- “ইসলামি রাষ্ট্র মুসলমান কৃষকদের নিকট থেকে তাদের মালিকানাধীন জমির উৎপাদিত শস্যের যে খাজনা আদায় করে, প্রচলিত ভাষায় তাকেই উশর বলা হয় ”

হাদিসের ভাষায় “মুসলিমদের জমিতে উৎপাদিত ফসলের এক দশমাংশ হারে যাকাত প্রদান করাকে উশর বলে।”

ইসলামি পরিভাষায়, “জমিতে উৎপাদিত ফসলের যাকাতকে উশর বলে।”

আরও পড়ুনঃ এতিম কাকে বলে? ইয়াতিমের অধিকার

উশর ফরজ হওয়ার কারণ

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ভূমিকে মানুষের জন্য সুসজ্জিত এবং বসবাসযোগ্য করে সৃষ্টি করেছেন। আর এ ভূমি হচ্ছে উৎপাদনের প্রধান ক্ষেত্র। বস্তুত ভূমিতে বীজ বপন হতে শুরু করে ফসল উৎপাদন করা পর্যন্ত সকল পর্যায়ে ধাপে ধাপে আল্লাহ্ সাহায্য করেন। তাই ফসল উৎপাদন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কখনো কখনো পানির প্রয়োজন হয়। এমতাবস্থায় আল্লাহপাক আসমান হতে পানির ব্যবস্থা করেছেন। সুতরাং আল্লাহ রাহুল আলামীনের ব্যবস্থাপনায় এসব কিছু সম্পন্ন হয়ে থাকে ।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, অর্থাৎ, “ইমানদারগণ তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি তা হতে উৎকৃষ্ট বস্তুর ব্যয় কর।” (বাকারা- ২৬৭)

এ থেকে বুঝা যায় যে, মহান আল্লাহর এক ব্যবস্থাপনায় তারই সৃষ্টি এই ভূমিতে ফসল ফল ফলাদির সমারোহ ঘটে থাকে। তাই আল্লাহর এ অসীম নিয়ামত ও অনুগ্রহের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা সকলের দায়িত্ব। আর সে শুকরিয়া আদায়ের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে জমির উৎপন্ন ফসল থেকে যাকাত আদায় করা যা ইসলামি পরিভাষায় উশর নামে পরিচিত।

উশর কাকে বলে | ওশর দেওয়ার নিয়ম
উশর কাকে বলে | ওশর দেওয়ার নিয়ম

ওশর/উশর শব্দের অর্থ কি?

উশর শব্দের আভিধানিক অর্থ এক-দশমাংশ। কিন্তু পরিভাষায় উশর হচ্ছে উৎপন্ন ফসলের যাকাত যা কোন জমির উৎপাদিত ফসলের দশ ভাগের একভাগ অথবা বিশ ভাগের একভাগ।

ওশর কিসের ওপর ওাজিব

ফসলের জাকাত বা উশর আদায় মুসলমানদের জন্য কেবল শরিয়াহর বিধানের দিক দিয়েই অপরিহার্য বা ফরজ নয়, বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে উশর আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এ দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী গ্রামে অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থায় বাস করে। এ দেশের দারিদ্র্য দূর করা, দরিদ্রদের পুনর্বাসন এবং তাদের স্বাবলম্বী করা উশর আদায় করার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। কিন্তু অত্যন্ত বেদনার কথা হলো, বাংলাদেশের জনগণ উশর সম্পর্কে তেমন অবগত নন। তাই তারা উশর আদায় করেন না। এভাবে শরিয়াহর একটি গুরুত্বপূর্ণ হুকুম বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে না এবং তার ফায়দা থেকে দেশের জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে।

উশরি ও খারাজি জমি

যেসব জমি বর্তমানে মুসলমানদের মালিকানায় রয়েছে এবং মুসলমানদের থেকেই ক্রয় বা মীরাসসূত্রে মুসলমানদের মালিকানায় এসেছে তা উশরী জমি। পক্ষান্তরে যেসব জমি বর্তমানে বা অতীতের কোনোকালে বিজাতীদের মালিকানায় থাকা সাব্যস্ত হবে, তা খারাজী জমি বলে বিবেচিত। আমাদের দেশের হুকুমও অনুরূপ। আর উশরী জমিতে উশর দেয়া ওয়াজিব।

উশর ও খারাজের পরিমাণ : শ্রম বা অর্থের বিনিময়ে জমিতে সেঁচ দেয়া না হলে উৎপন্ন ফসলের উশর অর্থাৎ দশ ভাগের এক ভাগ দান করে দিতে হবে। পক্ষান্তরে শ্রম বা অর্থের বিনিময়ে সেঁচ দেওয়া হলে বিশ ভাগের এক ভাগ দিতে হবে। খারাজের পরিমাণ মুসলিম রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে।

বাংলাদেশের জমি উশরী না খারাজী

বর্তমানে এব্যপারে সিদ্ধান্ত দেওয়া অত্যন্ত জটিল বরং অসম্ভব। এ দেশকে উলামায়ে কেরাম একসময় দারুল হরব বলে ঘোষনা করেছিলেন। এদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের জমি উশরী বা খারাজী কোনটিই হতে পারে না।

তবে ফিকহী দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করলে বুঝে আসে উক্ত হুকুম ঐ সকল দারুল হরব সম্পর্কে, যা পূর্বে থেকে দারুল হরব ছিল। আর আমাদের দেশ পূর্বে দারুল হরব ছিল না। বরং আটশত বছর দারুল ইসলাম থাকার পর দারুল হরব হয়েছিল। কজেই উক্ত হুকুম আমাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে না। আবার ইংরেজরা এদেশের ক্ষমতা দখলের পর যে সমস্ত জমি মুসলমানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে তাদের মালিকানা বাতিল করে হিন্দুদেরকে জমিদারী প্রদান করেছিল, ঐসকল জমিও উশরী নয়। তবে এধরনের জমি খুজেঁ বের করাও কঠিন। এক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত হল যে সকল জমি ধারাবাহিক ভাবে মুসলমানদের মালিকানায় চলে আসছে বলে প্রমান পাওয়া যায় সেগুলোকে উশরী ধরে উশর আদায় করবে।

আর যে সকল জমির ক্ষেত্রে জানা যায় যে, উক্ত জমি বিধর্মীর হাত থেকে মুসলমানদের হাতে এসেছে তবে তা খারাজী হিসাবে গন্য হবে এবং তার খারাজ আদায় করবে। যা প্রতিবছর একবার বর্তাবে। যদি উল্লে¬খিত সূরত জানা না যায় বা সন্দেহ হয় তবে সতর্কতা হিসাবে উশর আদায় করবে।

মাসআলাঃ জমির সেচ বৃষ্টির পানিতে সম্পন্ন হলে দশ ভাগের এক ভাগ উশর আদায় করবে। আর নিজ খরচে সেচ দিলে ফসলের বিশ ভাগের এক ভাগ উশর আদায় করবে।

উশরের নিসাব কত?

উশর হচ্ছে ১০ভাগের এক ভাগ উৎপাদিত ফসল থেকে আদায় করা তবে এর জন্য শর্ত রয়েছে তা হচ্ছে, বৃষ্টি অথবা ঝরনা ও নদ-নদীর পানির মাধ্যমে স্বাভাবিক ভাবে উৎপাদিত ফসল হতে হবে। যদি সেচ অথবা ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে উৎপাদন করা হয়ে থাকে তাহলে ২০ ভাগের এক ভাগ বা নিসফুল ‘উশর যাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে।

ওশর দেওয়ার নিয়ম

মাসআলাঃ সেচ ব্যতীত অন্যান্য খরচের দ্বারা উশরের পরিমানে কোন তারতম্য হবে না। অর্থাৎ বৃষ্টির পানিতে সেচ হলে অন্যান্য খরচ (যেমন সারের খরচ, কৃষক খরচ ইত্যাদি ) যত বেশীই হোক না কেন তা ধর্তব্য হবে না। বরং দশ ভাগের এক ভাগ উশর দিতে হবে।

মাসআলাঃ উশরের সম্পর্ক ফসল ফলার সথে। কাজেই জমিতে ফসল না হলে বা চাষ না করলে উশর দিতে হবে না।
মাসআলাঃ জমিতে ফসল হোক বা না হোক খারাজ সর্বাবস্থায় দিতে হবে।

মাসআলাঃ আমাদের দেশে সরকারের পক্ষ থেকে জমির যে খাজনা নেওয়া হয়, এর দ্বারা উশর আদায় হবে না। বরং ভিন্ন ভাবে আদায় করতে হবে। তবে সরকারী খাজনা দেওয়ার সময় দাতা যদি খারাজের নিয়ত করে তবে এর দ্বারা খারাজ আদায় হয়ে যাবে।

মাসআলাঃ যাকাত যাদেরকে দেওয়া যায় তাদেরকে উশর দেওয়া যায়।

উশরের বিধান

১. মোট উৎপন্ন ফসলের উপর আদায় করতে হবে। উশর আদায়ের পর অবশিষ্ট ফসল থেকে কৃষির যাবতীয় খরচ বহন করতে হবে।

২. যাকাত যেসব খাতে ব্যয় হবে, উশরও সেসব খাতে ব্যয় করতে হবে।

৩. দুজন মিলে চাষ করলে উশর উভয়ের উপর ওয়াজিব হবে, তা যদি বীজ একজনের হয় তবুও।

৪. জমির খাজনা দিলে উশর মাফ হয় না।

৫. উশর ফসলের আকারেরও দেয়া যায় অথবা তার মূল্যও দেয়া যায়।

৬. ফসল কম বেশি হোক উশর দিতে হবে।

৭. ওয়াকফ করা জমি চাষ করলে চাষির উপর উপর ওয়াজিব নয়।

৮. জমিতে যে চাষ করবে উপর তার উপরেই ওয়াজিব হবে তা সে জমি ভাড়া নিয়ে চাষ করুক অথবা ঝর্ণা নিয়ে চাষ করুক ।

১৯. বাগানে ফল পাকার পূর্বে বিক্রি করলে উশর খরিদদারের উপর ওয়াজিব হবে। পাকার পর বিক্রি করলে উপর বিক্রেতার ঘাড়ে পড়বে।

যেসব ফসলের উপর দিতে হয়

উশর মূলত মুসলমানদের জমিতে উৎপাদি ফসলের যাকাত। কিন্তু কোন কোন ফসলের উশর দিতে হবে এ নিয়ে ইসলামি আইনবিদগণের মধ্যে মত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

১. হযরত আবদুলাহ ইবনে উমর (রা.) সহ কিছু সংখ্যক তাবেয়ী এবং বিশিষ্ট আইনবিদগণের মতে, শস্যের মধ্যে গম ও এবং ফলের মধ্যে খেজুর, কিসমিস ও মুনাকার যাকাত দিতে হবে।

২. ইমাম আহম্মদ ইবনে হাম্বলের মতে- যেসব উৎপাদিত ফসল পরিমাণ করা যায় এবং শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায় সেসব ফসলের উশর আদায় করা ফরজ। যেমন- গম, ভূট্টা, মুসুর, কলাই ইত্যাদি। আর ফলমূল যেহেতু সংরক্ষণ উপযোগী নয়, তাই তাতে কোন উশর নেই।

৩. ইমাম মালেক (রা.) এর মতে, যেসব ফসল মানুষ সচরাচর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে থাকে এবং যা সংরক্ষণের পুরোপুরি উপযোগী তাতে উশর ওয়াজিব। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, ধান, গম, ডাল ইত্যাদি। (ফিকহ সুন্নাহ- ২৫০/১)

৪. কিন্তু ইমাম শাফেণী (রা.) এ ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করে বলেছেন- যেহেতু হিজাবের অধিবাসীগণ খেজুর ও আঙুর প্রসিদ্ধ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে তাই এগুলোর উপরও উপর ধার্য করা যুক্তিযুক্ত।

৫. ইমাম আবু হানিফার (রা.) এর মতে, উৎপাদিত ফসল কম হউক কিংবা বেশি হক, তাতে উশর দিতে হবে। তাই উশরে নির্দিষ্ট কোন নিসাব বা পরিমাণ নেই। তিনি তার স্বপক্ষে যুক্তি পেশ করতে গিয়ে বলেছেন, পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরীফে শুধু উৎপাদিত ফসলের উশর আদায়ের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এর কোন নিসাব বর্ণনা করা হয়নি ৷

উশরী ভূমি ও খারাজি ভূমির পরিচয়

উশরি ভূমি : “কোন জমির মালিক উক্ত জমির মালিক থাকা অবস্থায় যদি ইসলাম গ্রহণ করে তবে সে জমি উশরি জমিতে পরিণত হবে।” মুফতি মুহাম্মদ শফীর মতে, যদি কোন দেশ সন্ধি চুক্তি দ্বারা এমনিভাবে বিজয় হয় যে, তথাকার জনসাধারণও মুসলমান হয়ে গেছে, তবে এদের জমি পূর্ববৎ এদেরই থাকবে এবং তাদের উপর উশর ধার্য হয়ে তাদের ভূমি উশরি হয়ে যাবে। অথবা, কোন দেশ যুদ্ধবিগ্রহ যারা জয় করার পর ইমাম যদি সেখানকার ভূমি গণিমতের নিয়মমাফিক চারভাগ মুজাহিদদের মধ্যে ফণ্টন করেন এবং অবশিষ্ট একভাগ বায়তুলমালের জন্য রেখে দেন তবে মুজাহিদদের ভাগে প্রাপ্ত ভূমি উশরি ভূমিতে পরিণত হবে।

খারাজি ভূমিঃ যে কোন প্রকারের ভূমি পর্যায়ে খারাজি হতে পারে। যথা-

(ক) কোন অমুসলিম কোন মুসলিমের কাছ থেকে উশরী জমি ক্রয় করলে তা উশরী থাকে না বরং খারাজি হয় যায়।

(খ) কোন মুসলিম কোন অমুসলিম থেকে খারাজি জমি ক্রয় করে নিলে তা উপরী হয় না। বরং খারাজি থেকে যায়।

(গ) মুসলমানগণ কোন অমুসলিম দেশ যুদ্ধের মাধ্যমে জ্যা করে নেয়ার পর মুসলিম রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সেখানকার জমি মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন না করে অমুসলিমদের মালিকানায় রেখে দিলে সে জমি খারাজি হয়ে যায়।

শেষ কথা

উপযুক্ত আলোচনার পরিশেষে বলা যায় যে, যাকাত প্রদানের মতই দারিদ্র্য বিমোচনে উশর ও খারাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এটি ইসলামি রাষ্ট্রের আয়ের অন্যতম একটি উৎস। উশর ও খারাজ দারিদ্রা বিমোচনে যথেষ্ট অবদান রাখে। আমাদের প্রত্যেকের উচিত এটির যথাযথ বাস্তবায়ন করা।

ফেসবুকে আমরা

উশর কাকে বলে | ওশর দেওয়ার নিয়ম
উশর কাকে বলে | ওশর দেওয়ার নিয়ম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *