শিক্ষার্থীদের থেকে আর্থিক জরিমানা নেয়া কি জায়েজ? জরিমানা করা কি বৈধ?

শিক্ষার্থীদের থেকে আর্থিক জরিমানা নেয়া কি জায়েজ? জরিমানা করা কি বৈধ?

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু ৷ সুপ্রিয় পাঠক! সবাইকে আন্তরিক মোবারকবাদ ৷ আজ আমরা কথা বলবো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আর্থিক যে জরিমানা করা হয় এটা জায়েজ আছে কিনা? শিক্ষার্থীদের থেকে আর্থিক জরিমানা নেওয়া কি জায়েজ? এ সম্পর্কে ইসলাম কি বলে তা আলোচনা করার চেষ্টা করব ৷ আমাদের সঙ্গে থাকুন ৷

আরও দেখুনঃ স্বামীকে ভাই আর স্ত্রীকে বোন ডাকা যাবে কি? 

শিক্ষার্থীদের থেকে আর্থিক জরিমানা নেয়া কি জায়েজ? জরিমানা করা কি বৈধ?

যদি কেউ কারো কোনো ক্ষতি করে ৷ বিচারিক আদালত যদি মনে করে এই পরিমাণ আর্থিক তার ক্ষতি হয়েছে ৷ কেউ কারো সম্পত্তি নষ্ট করলো ৷ অথবা আঘাত করে আহত করলো ৷ দেশীয় আদালত যদি ইনসাফের সাথে দোষী ব্যক্তিকে কোনো অর্থদন্ড দেয় তা জায়েজ আছে ৷

আমাদের দেশে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন রকম জরিমানা শিক্ষার্থীদের করে থাকে ৷ ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে জরিমানা করা হয় ৷ টেস্ট পরীক্ষা না দিলে ৷ মার্ক কম পেলে ৷ অথবা অন্য কোনো কারণে আর্থিক জরিমানা করা হয় ৷ এই জরিমানার অর্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করতে পারবে কিনা? এটা প্রশ্ন হিসেবে দেখা যাচ্ছে ৷ আলেমদের মাঝে মূলত: আর্থিক জরিমানার মাধ্যমে শাস্তি দেয়া জায়েয কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। মতভেদের কারণ আছে ৷ যেহেতু এর বিরুদ্ধে সরাসরি কুরআন সুন্নাহর নস নাই ৷

শিক্ষার্থীদের থেকে আর্থিক জরিমানা নেয়া কি জায়েজ? জরিমানা করা কি বৈধ?
শিক্ষার্থীদের থেকে আর্থিক জরিমানা নেয়া কি জায়েজ? জরিমানা করা কি বৈধ?

একদল আলেম বলেন অবহেলাকারী ছাত্রের উপর আর্থিক জরিমানা ধার্য করা জায়েয নয় ৷ কেউ কেউ মনে করেন জরিমানার অর্থ ভাল ছাত্রদেরকে দিবেন অথবা দান করে দিবেন ৷ কিন্তু আর্থিক জরিমানার মাধ্যমে শাস্তি দেয়ার অধিকার শুধুমাত্র আইনানুগ শাসকের কিংবা তার স্থলাভিষিক্ত বিচারক ও কর্মকর্তাদের ৷

মৌলিক কথা হচ্ছে– কোন মুসলিমের সম্পদ গ্রহণ হারাম। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

قَالَ ‏”‏ أَىُّ يَوْمٍ هَذَا ‏”‏‏.‏ فَسَكَتْنَا حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُ سَيُسَمِّيهِ سِوَى اسْمِهِ‏.‏ قَالَ ‏”‏ أَلَيْسَ يَوْمَ النَّحْرِ ‏”‏‏.‏ قُلْنَا بَلَى‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَأَىُّ شَهْرٍ هَذَا ‏”‏‏.‏ فَسَكَتْنَا حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُ سَيُسَمِّيهِ بِغَيْرِ اسْمِهِ‏.‏ فَقَالَ ‏”‏ أَلَيْسَ بِذِي الْحِجَّةِ ‏”‏‏.‏ قُلْنَا بَلَى‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ بَيْنَكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا، فِي شَهْرِكُمْ هَذَا، فِي بَلَدِكُمْ هَذَا‏.‏ لِيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ، فَإِنَّ الشَّاهِدَ عَسَى أَنْ يُبَلِّغَ مَنْ هُوَ أَوْعَى لَهُ مِنْهُ

আবূ বাক্‌রাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত :

তিনি একদা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথা উল্লেখ করে বলেন, (মিনায়) তিনি তাঁর উটের উপর উপবেশন করলেন। জনৈক ব্যক্তি তাঁর উটের লাগাম ধরে রেখেছিল। তিনি বললেনঃ ‘এটা কোন্‌ দিন?’ আমরা চুপ করে রইলাম আর ধারণা করলাম যে, অচিরেই তিনি এ দিনটির আলাদা কোন নাম দিবেন। তিনি বললেনঃ “এটা কি কুরবানীর দিন নয়?” আমরা বললাম, ‘জি হ্যাঁ।’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন: ‘এটা কোন্‌ মাস?’ আমরা নীরব রইলাম আর ধারণা করলাম যে, অচিরেই তিনি এর আলাদা কোন নাম দিবেন। তিনি বললেনঃ ‘এটা কি যিলহাজ্জ মাস নয়?’ আমরা বললাম, ‘জী হ্যাঁ।’ তিনি বললেনঃ ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম, যেমন আজকের তোমাদের এ দিন, তোমাদের এ মাস, তোমাদের এ শহর মর্যাদা সম্পন্ন। এখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা (আমার এ বাণী) যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট এসব কথা পৌঁছে দেয়। কারণ উপস্থিত ব্যক্তি সম্ভবত এমন এক ব্যক্তির নিকট পৌঁছাবে, যে এ বাণীকে তার চেয়ে অধিক আয়ত্তে রাখতে পারবে।’

(মুসলিম ২৮/৯ হাঃ ১৬৭৯, আহমাদ ২০৪০৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৬৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৬৭)

জরিমানা করা কি বৈধ

আমাদের হানাফি মাযহাব মতে শাস্তিরূপে কারো উপর আর্থিক জরিমানা ধার্য করা নাজায়েয। কাজেই কেউ কোন গুনাহ করলে বা নিয়ম লঙ্গন করলে তার উপর আর্থিক জরিমানা ধরা যাবে না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

(لا يحل مال امرئ مسلم إلا بطيب نفس منه)

“কোন মুসলমানের সম্পদ তার আন্তরিক সন্তুষ্টি ব্যতীত হালাল নয়।” [মুসনাদে আহমাদ: ২০৭১৪, মুসনাদে আবু ইয়ালা: ১৫৭০, সুনানে বায়হাক্বি: ১১৩২৫]

আল্লামা শামী রহ. (১২৫২হি.) বলেন,

والحاصل أن المذهب عدم التعزير بأخذ المال. اهـ

“মোটকথা: শাস্তিস্বরূপ মাল নেয়া বৈধ না হওয়াই মাযহাবের ফায়সালা।” [ রদ্দুল মুহতার: ৪/৬২]

অনেক সময় হিফজ মাদরাসায় সবক বা অন্য কোনো বিষয় শুনাতে গিয়ে লুকমা (ভুল হওয়া বা আটকে যাওয়া) খেলে জরিমানা ধার্য করা হয় ৷ উল্লেখিত আলোচনার বোঝা গেলো সবিনায় বা আমুখতায় লুকমা গেলে আর্থিক জরিমানা করা জায়েজ হবে না।

জরিমান করা কি বৈধ?
জরিমান করা কি বৈধ?

কারো ক্ষতি করলে জরিমানা করা

যদি কোনো কর্মচারী ইচ্ছাকৃত কোনো কিছু নষ্ট করে ফেলে কিংবা দায়িত্বে অবহেলা বা সীমালঙ্ঘনের কারণে অথবা তাদের যেভাবে বলা হয়েছে তার বিপরীত কাজ করার কারণে কোনো কিছু নষ্ট হয়ে যায়; তাহলে সেক্ষেত্রে বাস্তবতানির্ভর ক্ষতিপূরণ নেওয়া যাবে। অর্থাৎ যে জিনিসটি নষ্ট করেছে এর মূল্য বা এরচেয়ে কম গ্রহণ করা যাবে।

ঠিক তেমনি কেউ যদি অপর কারো জিনিস নষ্ট করে ৷ তবে ইনসাফনির্ভর ক্ষতিপূরণ নেয়া যাবে ৷

(মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা: ২০৮৬৭; শরহু মুখতাসারিত তাহাভি ৩/৩৯৯; তাবয়িনুল হাকায়েক: ৬/১৪৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৪/৫০০)

ধার নিয়ে নষ্ট করলে জরিমানা

কোনো ব্যক্তি কারো থেকে কোনো সম্পদ ধার নিলো ৷ হোক বাইসাইকেল ৷ বা অন্য কোনো বস্তু ৷ তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে করণীয় কী?

ইসলামের দৃষ্টিতে ধার নেওয়া জিনিস যদি ধারগ্রহীতার অবহেলার কারণে নষ্ট হয় বা হারিয়ে যায়, তাহলে তার পূর্ণ জরিমানা দিতে হবে। যদি মোবাইল আপনার অবহেলার কারণে হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে থাকে, তাই আপনাকে আপনার মোবাইল জরিমানা দিতে হবে। (হিন্দিয়া : ৪/২৬৮, বেহেশতী জেওর : ৫/৪১৭, ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত : ১১/৬০)

গ্যাস বা বিদ্যুত বিল দিতে দেরিতে জরিমানা

গ্যাস বিল বা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে দেরি হলে যে জরিমানা নেয়া হয় সেটাও নাজায়েয ও হারাম।যেহেতু এত্থেকে বাচার কোনো রাস্তা নেই,কারণে রাষ্টীয়ভাবে এমনটা করা হয়েছে।তাই কেউ কখনো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে গেলে সে আদায় করে নেবে।

সমিতির চাঁদা দিতে দেরির জরিমানা

যথাসময়ে সমিতির চাঁদা জমা না দিলে আর্থিক জরিমানা করা জায়েয হবে না। তাই এই শর্ত করা যাবে না। এভাবে জরিমানা নিয়ে থাকলে তা মালিকদের ফেরত দিতে হবে কিংবা তা তাদের মূলধনের সাথে যোগ করে দিতে হবে।

যথাসময়ে চাঁদা আদায়ের জন্য এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে যে, এক বা দুই কিস্তির টাকা নির্ধারিত সময়ে না দিলে সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে।

তবে যদি ইচ্ছাকৃত অযথাই দেরী করে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে দু’ একবার সতর্ক করার পর আর্থিক জরিমানার একটি সুরত অবলম্বন করা যায় কতিপয় শর্ত স্বাপেক্ষে। যথা-

১. প্রতিষ্ঠানের সদস্য হবার সময় একটি ফরমে সদস্য লিখবে যে, আমি উক্ত প্রতিষ্ঠানে মাসিক এতো টাকা হারে মাসিক সঞ্চয় রাখব, যদি কখনো সঞ্চয় দিতে গড়িমসি করি, তাহলে প্রতি সঞ্চয় বাবত আমার উপর এতো টাকা জনকল্যাণমূলক ফান্ডে দান করা আবশ্যক।

২. প্রতিষ্ঠানের একটি জনকল্যাণমূলক ফান্ড থাকবে। যা সম্পূর্ণ মুল প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা হবে। এই ফান্ডের টাকা পয়সার উপর কোন প্রকার হস্তক্ষেপ মূল প্রতিষ্ঠান করতে পারবেনা। অর্থাৎ মুল প্রতিষ্ঠানের কোন প্রয়োজনে উক্ত ফান্ডের টাকা পয়সা খরচ করতে পারবেনা। এই ফান্ডের পুরো টাকা দিয়ে জনকল্যাণমুলক কাজ করা হবে।

ফরমে উল্লেখিত অঙ্গিকারনামাটি একটি একটি অঙ্গিকার হিসেবে সাব্যস্ত হবে। যা পূর্ণ করা সদস্যের উপর আবশ্যক হবে।

 

শেষ কথা

সুপ্রিয় পাঠক! আমাদের আর্টিকেলগুলো ভালো লাগলে কমেন্ট ও শেয়ার করে হাজারো মানুষের কাছে তা পৌঁছে দিতে পারেন ৷ আপনার কোন মন্তব্য বা পরামর্শ থাকলে তাও জানাতে পারেন ৷ নিচের কমেন্ট বক্সে লিখতে পারেন নির্দ্বিধায় ৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের সাথে যুক্ত হতে ক্লিক করুন ৷ আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করুন ৷ জাযাকাল্লাহ খাইরান ৷

শিক্ষার্থীদের থেকে আর্থিক জরিমানা নেয়া কি জায়েজ? জরিমানা করা কি বৈধ?
শিক্ষার্থীদের থেকে আর্থিক জরিমানা নেয়া কি জায়েজ? জরিমানা করা কি বৈধ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *